...
Updated: 23 Aug 2023
ভুমিকম্পঃ পর্দার আড়ালের দৃশ্য

মনে করো, আর দশটা দিনের মতই তুমি ঘুম থেকে উঠলে। ঘুম চোখে ক্লান্ত তুমি হেলতে দুলতে বেসিনে গেলে মুখ ধুতে। ঘুম চোখে মনে হচ্ছে যেন পুরো দুনিয়াই তোমার সামনে কাপছে। হঠাৎ লক্ষ করলে যে, ঘুমে নয়, আসলেই তোমার চারিদিকে সব কাপছে৷ পুরো এলাকা একদম ভয়াবহভাবে কেপে উঠেছে, পায়ের নিচের মাটি কেপে উঠেছে। এই ঘটনাটি আমাদের অনেকের কাছে অস্বাভাবিক হলেও ইন্দোনেশিয়া, জাপানের মত কিছু দেশে এটি একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এরকম কাপুনিকে কেউ হয়তো ভালোবাসেনা বলেই কি হচ্ছে তাকে সরল বাক্যে প্রকাশ করে ঘটনাটির নাম দিয়েছে ভূমিকম্প।

ভূমিকম্প! জ্বি, ইংরেজিতে যাকে বলে “Earthquake” একটি অন্যতম পরিচিত দুর্যোগ। ভূমিকম্প শব্দটার আভিধানিক অর্থ দেখলেই বোঝা যায় যে এটি হল ভূমির কম্পন। তবে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন প্রবল ঝাকুনিকেই আমরা ভূমিকম্প বলি। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ভূমিকম্প হলো 'প্লেট মুভমেন্ট' এর ফলে কোন বড় “রকবডি” তে ফাটলের ফলে নির্গত শক্তির ফলে ভূপৃষ্ঠের কম্পন। অনেক জটিল কথা হয়েছে। এবার সহজে আসি। তার আগে আমাদের ধারণা থাকতে হবে প্লেট সম্পর্কে। তবে এই প্লেট কোন খাওয়ার প্লেট না। লিথোস্ফিয়ারিক প্লেট। চলো দেখে নেই এটা আসলে কি।

বিভিন্ন গবেষনার পর বিজ্ঞানীরা আমাদের পৃথিবীকে ৪টি মূল স্তরে বিভক্ত করেছে। এরা হলো গভীর থেকে যথাক্রমে outer core, inner core, mantle ও crust । আমরা বাস করি এই ক্রাস্টের উপরে। ক্রাস্টের উপরিভাগ হলো পাথুরে কঠিন একটি স্তর, যাকে আমরা বলি লিথোস্ফিয়ার। এই লিথোস্ফিয়ার আবার কোন স্থির আবরণ না। লিথোস্ফিয়ার আবার পাজলের বিভিন্ন খন্ডে বিভক্ত। এই লিথোস্ফিয়ারের টুকরো গুলাকেই আমরা প্লেট বলি। এই প্লেটগুলা আবার স্থির নয়। আমাদের লিথোস্ফিয়ারের ঠিক নিচের স্তরকে বলা হয় এস্থেনোস্ফিয়ার। এই স্তর তুলনামূলক গভীরে বিধায় এখানে তাপ ও চাপ বেশি। ফলে এই স্তরের উপাদানগুলো আংশিক বিগলিত থাকে৷ এ অবস্থায় তারা অর্ধতরল বৈশিষ্ট্য দেখায়। এই বৈশিষ্ট্যের ফলে এর ঠিক উপরের প্লেটগুলাও এর উপর ভাসতে থাকে ও খুব ধীরে চলাচল করে৷ এতে এরা একে অপরের সাথে মাঝে মাঝে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়৷

তো সংঘর্ষ হয় ভালো কথা, সংঘর্ষটা কোথায় হয় বলে মনে হয়? যেহেতু একই স্তরে এই প্লেটগুলা ভাসমান, তাই প্লেটগুলার সীমানা বরাবর এরা সংঘর্ষ করে। এখন এই সংঘর্ষে স্বাভাবিকই দুটি প্লেট এর মাঝে ঘর্ষণ হয়। তবে মাঝে মাঝে এই ঘর্ষণ বেশি হয়ে গেলে প্লেটদের আপেক্ষিক নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সংঘর্ষের স্থানে প্রচুর শক্তি জমা হয়। এই জমা শক্তি একসময় প্লেটের শিলার মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করে বা শিলাখন্ডকে টুকরো করে ফেলে। এতে জমাকৃত শক্তি প্রবল কাপুনি সৃষ্টি করে। আর তখনই একে ভূমিকম্প বলা হয়। এই কাপুনি মূলত শব্দতরঙ্গ ও বিভন্ন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ আকারে নির্গত হয়, যাদের ভূতত্ত্ববিদরা বলে থাকে “Seismic Waves”। অন্যসব দুর্যোগের মত ভূমিকম্পের জন্য কিন্তু কোন পূর্বাভাস দেয়া যায়না। কারণ মাটির নিচে কোন শিলায় কখন ফাটল দেখা দিবে তা বলা অসম্ভব প্রায়। ফলে অনিশ্চিত এক বিপদ হয়েই আসে আমাদের মাঝে। তো, এইরকম একটা দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে অবশ্যই ভুমিকম্প বিষয়ে জানতে হবে আমাদের। ভূমিকম্প সাধারণত দুই বা ততোধিক প্লেটের সীমানা এলাকায় বেশি হয়। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে, আমাদের বাংলাদেশ এর অবস্থান ৩টি গুরত্বপূর্ণ প্লেটের মাঝে; ইউরেশিয়ান, ইন্ডিয়ান ও বার্মিজ প্লেটের বাউন্ডারিতে। ফলে বলার অবকাশ রাখেনা যে আমাদের দেশে ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল৷ তাই এই দুর্যোগের উৎপত্তি সম্পর্কে জ্ঞান রাখাটা আমাদের প্রত্যেকের জন্য জরুরি।


জহুর আহমেদ
ভূ-তত্ত্ব বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়